আলী এমবিএ করছে। সে চমৎকার ইংরেজি বলে।সাধারণত সৌদিদের, বিশেষ করে স্টুডেন্টদের কাছ হতে এত ভালো ইংরেজি শুনিনি। জানতে পারলাম সে ইউকে গিয়ে ৬ মাসের ইংলিশ কোর্স করে এসেছে। প্রায় সময়ই সে আমার কাছে আসে।আমরা গল্প করি ... তার খুব ইচ্ছে পড়াশোনা শেষ করে সে হোটেল বিজনেস শুরু করবে। আগেই বলেছি “আভা” একটি টুরিস্ট সিটি, তাই Summer এ এখানে Hotel Business খুব জমজমাট থাকে।আমার কাছে বিজনেস সম্পর্কে জানতে চায়, নতুন ট্রেন্ড কি, কি করলে সে একজন সফল বিজনেসম্যান হবে, ইত্যাদি।আমি বলি, সে হা করে মনযোগ সহকারে শোনে।
... একদিন সে আমতা আমতা করে বলল, “দক্তর, একটা কথা বলি?” (এখানে টিচারদের আরবিতে দক্তর/ডক্টর বলা হয়; মাঝে মাঝে মজা লাগে- PhD না করেও ড. হয়ে গেছি) আমি বললাম, অবশ্যই; ভাবলাম হয়তো নতুন কিছু জানতে চাইবে।
--- “তোমরা বাংলাদেশিরা তো ভালো না, তবে আমার ভাগ্য ভালো যে তুমি অন্য সবার মতো নও” (You, Bangladeshi people are not good. I am lucky that you are not like others.)
ততোক্ষণে আমার চেহারা ‘লাল’ হয়ে গেছে; কোনমতে বললাম, কেন?
--- “তোমরা সৌদি আরবে চুরি করো, মানুষ মেরে ফেল, রেপ কর, সব সময় ঝগড়া ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো, তোমাদেরকে কেউ পছন্দ করে না...”
আমি অল্প ক’দিন হলো এখানে এসেছি, এখনও অনেক কিছু বুঝার বাকী আছে। আলী একজন শিক্ষিত ছেলে- সে এভাবে চিন্তা করছে, প্রকৃতপক্ষে ব্যপারটা জানি কতটা ভয়াবহ। সে আরো বলল- “তোমাদের Government কেন শিক্ষিত লোক পাঠায় না? অশিক্ষিত লোকেরা এখানে মাসে ৩০০ রিয়াল বেতনে জব করে, আর অবৈধ কাজ করে বেশী রিয়াল পেতে চায়।”
সে তার লেপটপ আমার দিকে ঘুরিয়ে দিল। ইউটিউবের একটা ভিডিও (http://www.youtube.com/watch?v=সঙ্গত
কারনেই লিংকটি সরিয়ে ফেললাম) চলছে। আমার মাথা হেট হয়ে এল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আমার দেশের মানসন্মান ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে ... ভেতরে তীব্র যন্ত্রণা, তাড়ণা অনুভব করছিলাম তার ভুল ভেঙ্গে দেবার জন্যে। অল্প সময়ের মাঝে চিন্তা করলাম কি বলা যায়। ৩ টি পয়েন্ট তার সামনে তুলে ধরলাম।
১. ইন্ডিয়ান’রা এখানে সাংগঠনিকভাবে বেশ গোছাল। তারা অপকর্ম করে বাংলাদেশিদের উপর দোষ চাপিয়ে দেয়। ইন্ডিয়ানদের নিজস্ব পত্রিকা আছে, তারা সবসময় বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রোপাগেন্ডা চালায়। সৌদিরা এত কিছু না বুঝেই বিভিন্ন ঝামেলায় বাংলাদেশিদের দায়ী করে, অনেকটা prejudiced।
কলকাতার লোকেরা অপকর্ম করে নিজেদের বাংগালী বলে পরিচয় দেয়, আর সৌদিরা ধরে নেয় সে বাংলাদেশি।
২. মায়ানমার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে এখানে আসছে, এবং সংখ্যাটা অনেক। আমি স্বীকার করলাম এটা বাংলাদেশ সরকারের ব্যর্থতা। রোহিঙ্গারা অপকর্ম করলে বাংলাদেশের নাম হচ্ছে।
Click This Link
৩. সত্যিই কিছু বাংলাদেশি আছে যারা খারাপ কাজে লিপ্ত। তাদের আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত।
মনে হলো আলী কিছুটা বুঝতে পারলো। ইউটিউব হাতড়ালাম – তাকে Beautiful Bangladesh, Dr. Muhammad Yunus এর Social Business এর উপর clips দেখালাম। বললাম, YouTube এর একজন হচ্ছে বাংলাদেশি জ়ায়েদ করিম। সে অবাক হয়ে দেখলো, শুনলো। বাংলাদেশে এত সুন্দর! এমন লোকও আছে! আগেতো সে তা জানেনি ...
আলী’র কাহিনী এখানেই শেষ ... আলী’র মতো পৃথিবী’র বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক লোক আছে যারা বাংলাদেশকে নিয়ে একটা ভ্রান্তি’র মধ্যে আছে। বাংলাদেশের অর্জনগুলো তাদের কাছে পৌছেনি। আমরা বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং কী দিয়ে করবো? ২১ শে ফেব্রুয়ারি International Mother Language Day- অথচ বিদেশে আমাদের রাষ্ট্রদূতদের কোন ভূমিকাই নেই, তারা জানেনা কখন কি করতে হবে। আমাদের দেশের খুনীরা হয় রাষ্ট্রদূত।“পাট” – সেতো সোনালী অতীত। সিলেট, কক্সবাজার অথবা সুন্দরবনকে কি আমরা সেভাবে তুলে ধরতে পারছি?
কী দিয়ে আমরা ব্র্যান্ডিং করবো?
ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেদিন নোবেল পুরষ্কার পেলেন, সারা পৃথিবী জেনে গেলে বাংলাদেশের কথা। মানুষ যতবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জানলো, তার চেয়েও বেশী জানলো বাংলাদেশকে। কয়েকদিন আগে আমার এক বড়ভাই ফেসবুকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি YouTube Clip শেয়ার করলেন। আমি তন্ময় হয়ে শুনলাম তার Social Business এর কথা। কতটা জৌলুস তার বক্তৃতার মাঝে। বাংলাদেশে কি আর একজন ব্যক্তি আছে যে এত চমৎকারভাবে ইংরেজিতে বলতে পারবে? সবাইকে মোটিভেট করতে পারবে?
সারা পৃথিবী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জানে, জানে আমাদের এ দেশটাকে। আজ আমরা তাঁকে টেনে হিঁচড়ে মাটিতে নামাচ্ছি, তাতেও বোধয় শান্তি পাচ্ছিনা। আজ আমরা হিসেবের খাতাপত্র খুলে বসেছি। হিসাব কষছি- ব্যক্তি ইউনূস কতটুকু পেল, খুঁজে বের করছিনা বাংলাদেশ কতটুকু পেল।
একবার বিরিশিরি গিয়েছিলাম বেড়াতে। কথায় কথায় গ্রামের মানুষদের জিঙ্গেস করি গ্রামীন ব্যাংকের কথা, ব্র্যাকের কথা। তাদেরকে অসহায় মনে হলো। তারা আগে কখনও ঋণ কি জানতোনা, এখন তারা ঋণের চাপে জর্জরিত। তারা নতুন ঋণ পায় পুরুনো ঋণ শোধ করার জন্য। আছে উচ্চ সুদ। তার মাঝে অনেক ব্যতিক্রমি সফল মানুষও আছে।
কিন্তু উপরের YouTube Clip টিতে যেভাবে Microcredit এর ধারণা আছে, তাতে কিন্তু গরীব লোকদের সফল হবারই কথা। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো আমাদের কথা ও কাজে মিল নেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন একরকম, কিন্তু হয়তো করেছেন আরেক রকম।
... তারপরেও আমি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দোষ দেই না। তিনি আমাদের দিয়েছেন অনেক। আমরা তাকে ছুড়ে ফেলে না দিয়ে তার ভুলটুকু শোধরাতে পারতাম। এখনো তার অনেক কিছু দেয়ার আছে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। উনি বলেছিলেন, (হুবুহু এরকম নয়) একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠে প্রথম প্রজন্মের দূর্নীতির উপর ভিত্তি করে, ইউরোপের শিল্প বিপ্লব দূর্নীতির ফসল- আজ আমরা তার সুফল ভোগ করছি ...
আমাদের দরকার যোগ্য নেতৃত্ব, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো ব্যক্তিত্ব- যারা আজীবন দেশের জন্য কাজ করে যাবেন। যাদেরকে কোন প্রকার বয়সসীমা দিয়ে আটকে রাখবোনা। বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং অবশ্য একদিক দিয়ে হয়েই আছে। শেখ হাছিনা আর খালেদা জিয়া’র প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি আমাদেরকে বিশ্বের দরবারে খুব দ্রুতই পরিচিত করে তুলছে। তাদের বোধয় অবসরে যাবার বয়সসীমা নেই !!!
বিশেষ নোটঃ
আজ (মার্চ ১৫) সামহয়ারইনব্লগে একটা YouTube Clip পেয়ে গেলাম। খুবই interesting মনে হলো। ড. মুহাম্মদ ইউনূস কাছ হতে প্রথম ঋণ গ্রহনকারি সুফিয়া বেগমের কথা জানি, আরো জানি তিনি মারা গেছেন- নিঃস্ব অবস্থায়। কিন্তু এই YouTube Clip দেখাচ্ছে সুফিয়া বেগম এখনও বেঁচে আছেন।
মনির ২ মাস আগে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছে। কিন্তু তার পোস্টিং আভা’তে হয়নি, হয়েছে মাহাইল (Mahail) ক্যাম্পাসে । মাহাইল আভা’র মতো ঠান্ডা জায়গা নয়, বেশ গরম- ৩০ ডিগ্রির উপরে। সেখানে ৩/৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষক আছেন, কিন্তু তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। মনির নিঃসঙ্গ হয়ে গেল, ক্যাম্পাস, বাসা, টুকিটাকি বাজার- এই করেতো সময় কাটেনা। সে আমাদের মিস করতে থাকলো ... আমাদের বন্ধুদের আড্ডা বলে কথা!
তবে এরই মাঝে একটা সুযোগ হল ... সৌদি বাদশাহ স্বাস্থ্য উদ্ধার করে দেশে ফিরছেন, সারাদেশে আনন্দ। সেই আনন্দে শনিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি)ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে শোনা যায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে গণআন্দোলন দেখে, উনি অবকাশ যাপন কেন্দ্র থেকে কিছুটা তড়িঘড়ি করেই দেশে ফিরেছেন। দেশে ফিরেই সবাইকে খুশি করতে ৩৬০০ কোটি ডলারের সুযোগ সুবিধা ঘোষণা করেন।
আমাদের বৃহঃপতি ও শুক্রবার ছুটি, শনিবার মিলিয়ে টানা ৩ দিনের ছুটি হয়ে গেল। মনিরও বেশী দেরী করা সমিচীন মনে করেনি। বুধবার বিকেলেই জুঁই’কে (ওয়াইফ) নিয়ে আমাদের মাঝে হাজির। আমরাও খুশীতে আটখানা, ও থাকলে আড্ডাটা বেশ জমে উঠে। সে রাতে ৩টা পর্যন্ত আড্ডা হলো। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম “আল হাবালা” ঘুরতে যাব।
হাবালা সম্পর্কে কিছু বলতে হয়। আভা হতে ৪০ মাইল দূরে চমৎকার একটি টুরিস্ট স্পট। হাবালাকে বলা হয় ঝুলন্ত গ্রাম/দড়ি’র গ্রাম (Hanging Village/Village of Rope)। ১৯৭০ সালে মাইনিং রিসার্চ সেন্টারের একটি দল হেলিকপ্টারে অনুসন্ধানের সময় অদ্ভুত এই গ্রামটি দেখতে পায়। পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত একটি গ্রাম। পাহাড়ের মাথা হতে ৪০০ মিটার নীচে পাহাড়ের ফাঁটলে গ্রামটি গড়ে উঠেছিল। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে চলাচল বা বের হবার কোন উপায় ছিলনা, চারদিকই ছিল পাহাড় বেস্টিত। যোগাযোগে একমাত্র উপায় ছিল দড়ি বেয়ে পাহাড়ের মাথার দিকে উঠা। প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র দড়ি’র মাধ্যমে নামানো হতো। খুঁজে পাবার পরে গ্রামবাসীদেরকে কিং ফয়সাল ভিলেজে স্থানান্তরিত করা হয়। কেন তারা ওখানে ছিল? আগেই বলেছি, এ অঞ্চল একসময় তুর্কিরা শাসন করতো। আসির প্রদেশে (আভা হলো আসির প্রদেশের রাজধানী)কাহতানিরা (Qahtan Tribe) সবসময় প্রভাবশালী। সময়ক্রমে কাহতানিরা তুর্কিদের এ অঞ্চল হতে তাড়িয়ে দেয়। তুর্কিদের শাসনামলে নিরাপদে থাকার জন্যেই কাহতানিদের একটি গ্রুপ এখানে আবাস গড়ে।
পরবর্তীতে একে টুরিস্ট স্পটে পরিণত করা হয়। এখানেই আছে সৌদি আরবের ১ম কেবল কার। ৬০০ মিটার দীর্ঘ কেবল কারে করেই নীচের গ্রামটিতে নামতে হয়।
আল হাবালা- The Hanging Village
... তো বৃহঃপতিবার বিকেল ৩ টায় আমি ও শাকিলা, মনির ও জুঁই, মিলন ও লিজা, দিবা ও তার আব্বা এবং ইশরাত, ৯ জন রওনা দিলাম হাবালার উদ্দ্যেশে।
এখন এটি টুরিস্ট স্পট
৩০ মিনিটেই পৌছে গেলাম। পাহাড়ের একটি অংশকে দেখে আমার ওয়েস্টার্ন মুভি’র কিছু দৃশ্য মনে পড়ে গেল। পাহাড়ের প্রান্তে তারের বেড়া দেয়া, নীচের দিকে তাকাতেই ঝুলন্ত গ্রামটি দেখতে পেলাম।একটা জিনিষ গুলিয়ে ফেললে চলবেনা। আভা- পাহাড়ের উপরে তৈরি একটা শহর। শুরু হলো আমাদের ছবি তোলা। মনির একজন স্বাস্থ্যবান ছেলে, যে কোন ছবি তুললেই তার ৯০% জায়গা জুড়ে সে থাকে। মিলন ও লিজা কিছু রোমান্টিক ছবি তুলল। আমরা দু’জনও বেশ কিছু ছবি তুললাম-ভদ্র ছবি। ইশরাত একা ছিল, ছবি তোলার ব্যাপারে তার আগ্রহও ছিল বেশ। কি আর করা ! আমি অনেকগুলো ছবি তুলে দিলাম।তবে আমার আগ্রহ ছিল প্রকৃতির দিকে। মরুর বুকে এতো চমৎকার কিছু ফুল ফুটে ছিল যে বার বার অবাক হচ্ছিলাম কিভাবে এগুলো বেঁচে আছে। এতো সতেজ আর মোহময়ী।
অনাদরে বেড়ে উঠা ...
সামনেই কেবল কার স্টেশন, ভেতরে ঢুকতেই কৃত্রিমভাবে লাগানো ফুল চোখে পড়ল। একটা জবা গাছও দেখলাম।
বাগানে লাগানো ...
টিকেট কাটতে গিয়ে দেখলাম দু’জন বাংলাদেশি ভাই টিকেট বিক্রি করছে। টিকেটের দাম জনপ্রতি ৪০ রিয়াল। উনারা আমদের ডিসকাউন্ট দিলেন, ৩০ রিয়াল করে রাখলেন। এই প্রথম কেবল কারে চড়ছি, আমার ধারনা ছিল কেবল কার হরিজন্টাল পথে চলে। কিন্তু এটা পাহাড়ের উপর হতে নীচে নামছে, ৪৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে। জুঁইতো ভয়ে চোখ বন্ধ করলো আর মনিরকে খাঁমচে ধরলো। নীচে সবকিছু সাজানো গোছানো, ভালো লাগলো। মনেই হয়নি মরুভূমিতে আছি ... চারিদিকে গাছের জঙ্গল- বাংলাদেশের মতো সবুজ। বুক ভরে শ্বাস নিলাম, দৌড়ে বেড়ালাম।
কেবল কার, নীচে নামছে
কেবল কার লাইন
উপর হতে দেখা ...
অনেক সাজানো গোছানো
ফণীমনসার ঝোপ
মেয়েরা আবিষ্কার করলো এখানে কিছু ‘জিরা গাছ’ জন্মেছে, আমরা ঘ্রাণ নিলাম। এখানে সেখানে কিছু ভাঙ্গা ঘর/বাড়ি ছিল, আগের দিনের বসতি। বেশ কিছু সৌদি ফ্যামিলিও ঘুরতে এসেছিল, তারা অবাক হয়ে আমাদের দেখছিল। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল, রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। ওখানে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানেও এক বাংলাদেশি। ড্রিঙ্কস আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেয়ে বাসার পথে...
খাবারের জন্য অপেক্ষা ...
ড্রিঙ্কস আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই
বাসার পথে...
বাসায় আসতে আসতে অনেক রাত হয়ে যায়। রাতে আমাদের বাসায় মনির আর মিলনদের খাবার দাওয়াত ছিল। কিছুই করা হয়নি। বাজার করে রান্না শেষ হতে হতে রাত ১১ টা। খিচুরি, মুরগির মাংস, সর পুটি আর হামুর মাছ (সী ফিশ) খেলাম তৃপ্তিভরে। তারপর ম্যারাথন আড্ডা, মনির আসর জমিয়ে রাখলো তার মতো করেই। রাত ৩ টা বেজে গেলেও কেউই তো উঠতে চায়না, শেষ পর্যন্ত জোর করে তাদের বের করতে হলো।
দি এ টিম ...
এখানে আসার পর খাবার দাবার নিয়ে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। বাসা হতে বের হলেই শাক/সব্জি’র দোকান।
আর তা বেশিরভাগই বাংলাদেশীদের। আমি ভোজন রসিক, ডাল আর শাক/সব্জি খুব পছন্দ করি। শম্পা ভাবী তা জানেন, তাই শম্পা ভাবী দাওয়াত করলে ধরে নেই ডাল থাকছেই। আমার স্ত্রীও তিন ধরণের ডাল (মুসুর, মুগ, মাসকলাই)মিক্স করে চমৎকার ভূণা করে ... খেতে এককথায় অমৃত। সেই আমি যদি দেখি দোকানে থরে থরে শাক/সব্জি আর ডাল সাজানো, খুশীতো হবই ।
প্রথম যেদিন সব্জি কিনতে গেলাম – অবাক হলাম। কি নেই? ... লাল শাক, পালং এর মতো শাক, কচু’র মুখী/লতি, পটল, কাকরোল, কুমড়া, আলু, শাজনা, বরবটি, বাঁধাকপি, ফুলকপি ... আরো কত কি, সবতো মনেও নেই। এমন কিছু সব্জি ছিল যার তখন বাংলাদেশে সিজন না। জানতে চাইলাম কোথা থেকে আসে সব্জিগুলো... আভা’য় বাংলাদেশীরা ক্ষেত (আরবিতে “মাজরা” বলে)করে, এখানকার মাটি খুব উর্বর, ফলে সব ধরনের সব্জিই এখানে হয়। প্রথমদিনই ব্যাগ ভর্তি করে শাক/সব্জি নিয়ে আসলাম। পালং এর মতো শাকটি যে এতো মজা হতে পারে, খাওয়ার আগে ধারণা ছিল না।
দেশ হতে আসার সময় ইলিশ মাছ আর হাসের মাংস নিয়ে এসেছিলাম।এখানে পাই কিনা সন্দেহ ছিল। মাছ কিনতে গিয়ে সে ধারণাও ভাঙ্গলো... বড় বড় ইলিশ মাছ শুধু কলকাতাতেই যায় না সৌদিতেও আসে। মাছগুলো বাংলাদেশ হতে প্যকেটজাত হয়ে আসে। আঁশসহ ও পরিস্কার করা দু’ধরণের মাছই পাওয়া যায়। শাকিলা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, যাক মাছ পরিস্কার করা নিয়ে ভাবতে হবে না। একদিন কাচকি মাছ খেলাম... আহ !!
সৌদি আরব তথা মধ্যপ্রাচ্য হচ্ছে বাংলাদেশী খাদ্যপণ্যের বিশাল বাজার। প্রাণে’র মুড়ি/চানাচুর, রাধুনি’র মশলা প্রতিটি দোকানেই পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশিদের দেখলাম ছোট দোকান দিয়েই খুশি, কেননা বড় স্টোরগুলো বেশির ভাগই ইন্ডিয়ানদের।
এখানে খাবারের দাম আমার কাছে সস্তাই মনে হয়েছে। সবচেয়ে সস্তা হচ্ছে “খবুজ”- এক ধরনের রুটি, বাংলাদেশের তুন্দুল রুটির মতোই প্রায়। মাত্র ১ রিয়ালে ৬ টি খবুজ পাওয়া যায়। আমি অল্পদিনেই এর প্রেমে পড়ে গেলাম। ডাল ভুনা অথবা মুরগির মাংস দিয়ে খেতে আমার দারূণ লাগে। আদিল ভাই আবার খবুজ় খেতে পারেননা, তাই উনাকে মোটিভেট করার জন্য প্রায়ই উনার সামনে খবুজের গুনগান করি... আমার রসালো খাবারের বর্ণনা দেই। উনার কথা হলো “খবুজ মাইনষে খায়? ভ্যাপসা গন্ধ করে”।
আরেকটি জিনিষ আমার পছন্দ- “তামিয়া মোশাক্কেল”। দূর্ভাগ্যক্রমে আদিল ভাই আর মিলনের এটা পছন্দ না। তবে আদিল ভাইয়ের কাছে নাকি এখন ভালো লাগছে। মিলনতো বলে, “এটা কোনো স্মার্ট খাবার না, শরীর না বাঁচিয়ে এটা খাওয়া যায় না”।তামিয়া মোশাক্কেল খেতে গেলে মুখে হয়তো সস লেগে যাবে, জামা’র উপর ভাঙ্গা অংশ পড়বে- মানে ঝামেলা হবেই। তামিয়া মোশাক্কেল পাওয়া যায় ২ রিয়ালে। অর্ধেক খবুজের ভেতর ডিম ফালি, শষা, টমেটো, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পিয়াজু, সস ও মেয়োনেজ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। এটা মূলত একধরণের মিক্সড স্যান্ডউইচ।
প্রথম যখন উমরার জন্য গেলাম, ডিনারের জন্য গাড়ী থামালো মরুভূমিতে, একটা রেস্টুরেন্ট, মসজিদ আর অল্প কিছু দোকানপাট। আশে পাশে লোকালয় নেই। অথচ রেস্টুরেন্টে জমজমাট অবস্থা। অবাক ব্যপার সবাই রেস্টুরেন্টের ভেতরে নয়, বাহিরে বসে আছে। ভেতরে চেয়ার, টেবিল থাকলেও তা ফাঁকা। বাহিরে ছোট ছোট ৩ বর্গফিটের গদি মোড়ানো জায়গা, হেলান দেবার জন্য কোল বালিশ, হুক্কা, আলাদা টেলিভিশন। পরিচিতদের নিয়ে সৌদিরা এমন গদি মোড়ানো জায়গায় আড্ডা দেয়, খায় দায়, হুক্কা টানে। এমন ১০/১২ টি স্পেস দেখলাম।
আমারা খাবারের অর্ডার দিতে গেলাম। সবাই আরবি বলছে, কিছুই বুঝাতে পারলাম না। খুঁজে একজন বাংলাদেশিকে পেলাম। এই রেস্টুরেন্টে কাজ করে। যা জানলাম তাতে হতাশ হলাম, বাংলাদেশি খাবারের কাছাকাছি কিছু নেই। উনি আল-ফাহাম খেতে বললেন।
বড় থালায় বিশেষ ধরনের রান্না করা ভাতের মাঝখানে ঝলসানো মুরগী। বুঝতে পারলাম না কিভাবে খাব। শুকনো আর খটখটে। একটু মজাও লাগলোনা। খেতে পারলাম না। বাহিরে এসে দেখি সৌদিরা ছোট ছোট স্পেসগুলোতে বিশাল বড় থালার চারপাশ ঘিরে মজা করে ৫/৬ টি মুরগী সহ আল-ফাহাম খাচ্ছে। আমার মনে হলো সৌদিরা খাবারের বেশ অপচয় করে, অল্প কিছু খেয়ে ফেলে দেয়। আর তারা নোংরা, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে, হয়তো গাড়ী দিয়ে যাচ্ছে- পেপসির বোতলটা রাস্তার মাঝখানেই ফেলবে। বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নকর্মীরা আছে বলেই রক্ষা।
... তো উমরা হতে এসে আল-ফাহাম না খেতে পারার ঘটনাটা সবাইকে বলছিলাম... আদিল ভাই লাফ দিয়ে উঠলেন –“আরে বলো কি ঐটাইতো মজার খাবার...” ... চমকিত হলাম, আমার যেটা অপছন্দ সেটাই নাকি আদিল ভাইয়ের আর ভাবী’র সেরা। প্রসঙ্গতঃ আদিল ভাই প্রতি শুক্রবার দুপুর এবং রাতের খাবার সারেন আল-ফাহাম দিয়ে।
ঘটনাচক্রে আমার এক কাজিন একদিন তার বাসায় আমাকে দাওয়াত করলো, গিয়ে দেখি আল-ফাহাম রান্না হয়েছে। ভাগ্যবুঝি একেই বলে !!! তবে রান্নাটা বাংলাদেশি টাইপ হয়েছিল এবং ভালো লেগেছিল। সবাই মিলে সৌদি কায়দায় আল-ফাহাম খেলাম। সবাই একে অপরকে বেশী বেশী ঠেলে দিচ্ছিল।একসাথে খাওয়ার মজা বুঝি এটাই। (চলবে)
কাজিনের রান্না করা আল-ফাহাম